× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনরকমারিপ্রবাসীদের কথাবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা ইলেকশন কর্নার মন ভালো করা খবর
ঢাকা, ২২ অক্টোবর ২০১৯, মঙ্গলবার

ইউরোপে অস্থিতিশীলতার নেপথ্যে রাশিয়ার টপসিক্রেট গুপ্তচর বাহিনী

বিশ্বজমিন

মানবজমিন ডেস্ক | ৯ অক্টোবর ২০১৯, বুধবার, ১১:১২

প্রথমে মলদোভাতে চালানো হয় নাশকতা। তারপর বুলগেরিয়ায় বিষক্রিয়ায় হত্যা করা হয় এক অস্ত্র ব্যবসায়ীকে। এরপর মন্টিনিগ্রোতে ব্যর্থ অভ্যুত্থান। এছাড়া গত বছর বৃটেনে সাবেক এক পক্ষত্যাগী রাশিয়ান গুপ্তচরকে নার্ভ এজেন্ট বা ¯œায়ু গ্যাস প্রয়োগ করে হত্যার চেষ্টা করা হয়। উপরের প্রায় প্রত্যেকটি ঘটনায় রাশিয়ার গুপ্তচর সংস্থার ছাপ দেখতে পেয়েছে পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। কিন্তু কর্তৃপক্ষ প্রথম দিকে ভেবেছিলেন এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা।
কিন্তু পশ্চিমা নিরাপত্তা কর্মকর্তারা এখন এই অনুসিদ্ধান্তে এসেছেন যে, এই কার্যক্রমগুলো একই সূত্রে গাঁথা। নাশকতামূলক কর্মকান্ড পরিচালনার মাধ্যমে ইউরোপকে অস্থিতিশীল করার সমন্বিত চলমান প্রচেষ্টা। আর এই অভিযানগুলো পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে রাশিয়ার গুপ্তচর বাহিনীর একটি এলিট ইউনিট, যারা নাশকতা, গুপ্তহত্যা ও অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকা- পরিচালনায় বিশেষভাবে দক্ষ।
পশ্চিমা নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এ খবর দিয়েছে নিউ ইয়র্ক টাইমস।
খবরে বলা হয়, অত্যন্ত গোপনীয় এই বিশেষ ইউনিটের নাম ইউনিট ২৯১৫৫। প্রায় এক দশক ধরে এটি কার্যকর রয়েছে। তবে পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এর অস্তিত্ব জানতে পারে সম্প্রতি। চারটি ভিন্ন ভিন্ন ইউরোপিয়ান দেশের গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, এই ইউনিটকে কত বেশি কাজে লাগানো হয় তা স্পষ্ট নয়। তারা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে, এই ইউনিটের সদস্যরা কখন ও কোথায় হামলা চালাবে, তা জানা সম্ভব নয়।
ইউনিট ২৯১৫৫-এর কার্যক্রম থেকে অনুমেয় কতটা সক্রিয়তা নিয়ে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন পশ্চিমের বিরুদ্ধে লড়ছেন। একে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাইব্রিড যুদ্ধ। প্রোপাগান্ডা বা অপপ্রচার, হ্যাকিং ও মিথ্যা তথ্য প্রচারের পাশাপাশি চলছে প্রকাশ্যে সামরিক চ্যালেঞ্জ।
অবসরপ্রাপ্ত সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও মস্কোয় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের সাবেক ডিফেন্স অ্যাটাচে পিটার জক বলেন, আমার মনে হয় আমরা ভুলে গেছি রাশিয়ানরা কতটা নৃশংস হতে পারে। তবে পিটার জক বলেছেন, তিনি ওই ইউনিটের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানেন না।
অপরদিকে এক টেক্সট বার্তায় প্রেসিডেন্ট পুতিনের মুখপাত্র দিমিত্রি এস. পেসকব ওই ইউনিটের ব্যাপারে যেকোনো প্রশ্ন রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কে করার অনুরোধ জানান। তবে মন্ত্রণালয় থেকে কোনো মন্তব্য করা হয়নি। খবরে বলা হয়, মস্কোর পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত ১৬১তম স্পেশাল পারপোস স্পেশালিস্ট ট্রেইনিং সেন্টারের সদরদপ্তর থেকে এই ইউনিটের কার্যক্রম চালানো হয়। এটি নিয়ন্ত্রণ করা হয় রাশিয়ার সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা জি.আর.ইউ থেকে। অবশ্য জি.আর.ইউ-এর বেশিরভাগ কর্মকা-ই রহস্যে ঘেরা। তবে পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এই সংস্থার কাঠামো নিয়ে আগের চেয়ে স্পষ্ট ধারণা পেতে শুরু করেছেন। মার্কিন কর্মকর্তারা বলে আসছেন, ২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে জি.আর.ইউ-এর দু’টি সাইবার ইউনিট ডেমোক্রেটিক ন্যাশনাল কমিটি ও ডেমোক্রেট দলীয় প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনের প্রচার শিবিরের কম্পিউটার সার্ভারে অনুপ্রবেশ করতে সক্ষম হয়। সেখান থেকে প্রাপ্ত অভ্যন্তরীণ বার্তা প্রকাশ করে দেয়া হয়।
গত বছর, ২০১৬ সালের নির্বাচনে রাশিয়ার হস্তক্ষেপ নিয়ে করা মার্কিন তদন্তের দায়িত্বে থাকা বিশেষ কৌঁসুলি রবার্ট মুয়েলার জি.আর.ইউ-এর ওই দুই ইউনিটের এক ডজনেরও বেশি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেন। তবে তারা এখনও পলাতক। জি.আর.ইউ-এর হ্যাকিং দল মূলত মস্কো থেকেই কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। কিন্তু নতুন আবিষ্কৃত ইউনিট ২৯১৫৫-এর সদস্যরা ইউরোপের দেশে দেশে ঘুরে বেড়ান। এদের কেউ কেউ রাশিয়ার বিভিন্ন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই ইউনিটের কার্যক্রম এতটাই গোপন যে, এই ইউনিটের অস্তিত্বের কথা জি.আর.ইউ-এর অন্য কর্মকর্তাদেরও জানা নেই।
এছাড়া ইউনিটের সদস্যরা পারিবারিক ও ব্যক্তিজীবনেও দৃশ্যত নিজেদের মধ্যেই বিচরণ করেন। ২০১৭ সালে নেয়া এক ছবিতে এই ইউনিটের কমান্ডার মেজর জেনারেল আন্দ্রেই ভি. আভেরিয়ানভকে তার মেয়ের বিয়েতে দেখা যায়। সেখানে তার সঙ্গে ছিলেন কর্নেল আনাতোলি ভি. শেপিগা। এই ভি. শেপিগা সহ আরেক কর্মকর্তাকেই সাবেক পক্ষত্যাগী রাশিয়ান গুপ্তচরের শরীরে বিষপ্রয়োগের অভিযোগে বৃটেনে দোষী সাব্যস্ত করা হয়।
একজন ইউরোপিয়ান নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেন, ইউরোপজুড়ে এই ইউনিট বহু বছর ধরে সক্রিয় ছিল। এমনকি বন্ধুভাবাপন্ন দেশগুলোতে পর্যন্ত এই জি.আর.ইউ, এই ইউনিট খুবই ভয়ঙ্কর নাশকতামূলক কার্যক্রম চালিয়েছে, যা খুবই আশ্চর্য্যজনক।
তবে যে ৪টি ঘটনার জন্য এই ইউনিটকে সন্দেহ করা হচ্ছে, তার প্রত্যেকটি নিয়েই অনেক আলোচনা দেখা গেছে। যদিও কর্তৃপক্ষ এসব ঘটনার পেছনে রাশিয়ার সংশ্লিষ্টতা আবিষ্কার করতে সময় নিয়েছেন। ২০১৬ সালে মন্টেনিগ্রোতে ব্যর্থ অভ্যুত্থানের সঙ্গেই প্রথম রাশিয়ান সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়। ওই অভ্যুত্থান চেষ্টায় ইউনিটটির দুই কর্মকর্তা মন্টেনিগ্রোর প্রধানমন্ত্রীকে হত্যা ও পার্লামেন্ট ভবন দখলে নেওয়ার পরিকল্পনা করে। কিন্তু ২০১৮ সালের মার্চে এসে যখন রাশিয়ার পক্ষত্যাগী সাবেক গুপ্তচর ও তার মেয়েকে নার্ভ এজেন্টের মাধ্যমে হত্যা করার চেষ্টা করা হয়, তখন ইউরোপিয়ান কর্মকর্তারা বুঝতে শুরু করেন সব ঘটনাই একই সূত্রে বাঁধা।
ওই বিষপ্রয়োগের ঘটনায় পশ্চিমা দেশগুলোতে তোলপাড় শুরু হয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্র সহ ২০টি দেশ অন্তত ১৫০ জন রাশিয়ান কূটনীতিককে বহিষ্কার করে। চূড়ান্তভাবে বৃটিশ কর্তৃপক্ষ দু’জন সন্দেহভাজনকে চিহ্নিত করে। এদের একজন কর্নেল চেপিগা ও অ্যালেক্সান্ডার মিশকিন। ছয় মাস পর তাদের বিরুদ্ধে নার্ভ এজেন্ট বহনের অভিযোগে অভিযোগ দায়ের করা হয়।
তবে ওই অভিযান সম্পর্কে তখন সাধারণভাবে যত তথ্য প্রকাশ করা হয়েছিল, বাস্তবে সেটি ছিল আরও জটিল। ওই বিষপ্রয়োগের ঘটনার ঠিক ১ বছর আগে, ইউনিট ২৯১৫৫-এর ৩ জন সদস্য বৃটেন সফর করেন। সম্ভবত, রেকি করার জন্যই তারা ওই সফর করেছিলেন। এদের একজন ছিলেন মিশকিন। অপরজন সের্গেই পাভলভ নামে ছদ্মনাম ধারণ করেন। গোয়েন্দারা মনে করেন, সের্গেই ফেদোটভ নামে তৃতীয় আরেক গুপ্তচর আড়াল থেকে পুরো অভিযান তত্ত্বাবধান করেছিলেন।
খুব শিগগিরই ইউরোপিয়ান কর্তৃপক্ষ বুঝতে পারে, এই তিনজনের অন্তত দুইজন এমন একটি দলের সদস্য ছিলেন যারা বুলগেরিয়ার সমরাস্ত্র ব্যবসায়ী এমিলিয়ান গেভরেভকে বিষপ্রয়োগে হত্যার চেষ্টা চালায়। এই দল অন্তত দু’বার গেভরেভকে হত্যার চেষ্টা চালায়। একবার রাজধানী সোফিয়ায়, আরেকবার কৃষ্ণ সাগরের তীরে তার নিজের বাড়িতে।
ফেব্রুয়ারিতে মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে যোগ দিয়ে বৃটেনের বহিঃগোয়েন্দা সংস্থা এমআই-৬ এর প্রধান অ্যালেক্স ইয়োংগার রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান হুমকির বিরুদ্ধে সরব হন। তখনই তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন ওই ঘটনাগুলোর মধ্যে যোগসূত্র রয়েছে। তবে কোনো ইউনিটের নাম তখন তিনি বলেননি।
মন্টিনিগ্রোর ব্যর্থ অভ্যুত্থান চেষ্টা ও বৃটেনে বিষপ্রয়োগের ঘটনা ক্ষেত্রে ইয়োংগার বলেছিলেন, আপনারা দেখতে পাচ্ছেন সমন্বিত কর্মকা-। আর হ্যাঁ, প্রায়ই একই মানুষজনই তা করেছে। তিনি বলেন, আমাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জি.আর.ইউ ও অন্যান্য রাশিয়ান সংস্থা থেকে হুমকি বাড়ছে।
অপরদিকে, এ বছরের নভেম্বরে জি.আর.ইউ-এর একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে প্রেসিডেন্ট পুতিন সংস্থাটির লোগো সম্বলিত একটি টুপি পরেন। তিনি একে ‘কিংবদন্তিতুল্য’ সংস্থা বলে আখ্যা দেন। পুতিন নিজেও একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা। তিনি ওইদিন নিজের ভাষণে সাবেক সোভিয়েত গুপ্তচরদের সঙ্গে জি.আর.ইউ-এর পার্থক্য দেখাতে গিয়ে বলেন, জি.আর.ইউ-এর রয়েছে কিছু অনন্য গুণ, যা আগের চেয়ে ভিন্ন ধরণের শত্রুর বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হচ্ছে। পুতিন সেখানে বলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সংঘাতের ঝুঁকি বিশ্বজুড়ে কেবল বাড়ছেই। উস্কানি ও মিথ্যা ব্যবহৃত হচ্ছে, কৌশলগত সমতা বিনষ্ট করতে চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
২০০৬ সালে পুতিন একটি আইনে স্বাক্ষর করেন যাতে বিদেশে হত্যাকা- বৈধ করা হয়। ঠিক ওই বছরই রাশিয়ান গুপ্তঘাতকদের একটি দল লন্ডনে বিষাক্ত রেডিওঅ্যাকটিভ আইসোটোপ ব্যবহার করে হত্যা করে অ্যালেক্সান্ডার ভি. লিটভিনেঙ্কো নামে আরেক পক্ষত্যাগী গুপ্তচরকে।
তবে ইউনিট ২৯১৫৫ রাশিয়ার একমাত্র সংস্থা নয় যারা ওই ধরণের ভয়ঙ্কর অভিযান পরিচালনার অনুমোদনপ্রাপ্ত। বৃটিশ কর্মকর্তারা বলেছিলেন, লিটভিনেঙ্কোকে হত্যা করেছিল ফেডারেল সিকিউরিটি সার্ভিস, যার নেতৃত্বে একসময় ছিলেন খোদ পুতিন। এই সংস্থা অবশ্য জি.আর.ইউ-এর সঙ্গে প্রায়ই প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়।
তবে এই ইউনিটের ভয়ঙ্কর কার্যক্রম নিয়ে যেমন আতঙ্ক রয়েছে, তেমনি ইউরোপিয়ান কর্মকর্তারা তাদের কিছু বোকামি দেখেও অবাক হয়েছেন। যেমন, অত্যন্ত বিষাক্ত উপাদান ব্যবহার করা হলেও, লন্ডনে পক্ষত্যাগী গুপ্তচর স্ক্রাইপাল ও বুলগেরিয়ান অস্ত্র ব্যবসায়ী গেবরেভ কিন্তু শেষ পর্যন্ত বেঁচে যান। মন্টেনিগ্রোতে চালানো ব্যর্থ অভ্যুত্থানের সময় বিশ্বব্যাপী নজর চলে যায় সেদিকে, কিন্তু সেই অভিযানও ব্যর্থ হয়। এক বছর পর, মন্টেনিগ্রো বরং ন্যাটো-তে যোগ দেয়। তবে নিরাপত্তা কর্মকর্তারা এ-ও বলেছেন যে, হয়তো তাদের সফল অভিযানও থেকে থাকতে পারে, যার কথা এখনও জানা সম্ভব হয়নি।
তবে এই ব্যর্থতা কি ক্রেমলিনের বিরক্তির উদ্রেক ঘটিয়েছে? গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, এমনও হতে পারে এই অভিযানগুলোর সাফল্য-ব্যর্থতা নিয়ে কারও কোনো মাথাব্যাথা ছিল না। এস্তোনিয়ার সাবেক গোয়েন্দা প্রধান এরিক-নিলস ক্রস বলেন, এই ধরণের গোয়েন্দা অভিযান মূলত তাদের মনস্তাত্বিক যুদ্ধের অংশ হয়ে গেছে। এমন নয় যে, তারা খুব আক্রমণাত্মক হয়ে উঠছে। প্রকৃতপক্ষে, তারা চায় তাদের অবস্থানের জানান দিতে। এটি তাদের কৌশলেরই অংশ।

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর