× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনরকমারিপ্রবাসীদের কথাবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা ইলেকশন কর্নার মন ভালো করা খবরসাউথ এশিয়ান গেমস- ২০১৯
ঢাকা, ৭ ডিসেম্বর ২০১৯, শনিবার

হঠাৎ বিস্ফোরণ মুহূর্তেই সব শেষ

প্রথম পাতা

স্টাফ রিপোর্টার, চট্টগ্রাম থেকে | ১৮ নভেম্বর ২০১৯, সোমবার, ৯:২৪

চট্টগ্রাম কোতোয়ালি থানার পাথরঘাটা এলাকার ধনা বড়ুয়ার বাড়িতে গ্যাস লাইনের রাইজার বিস্ফোরণে ৭ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় দগ্ধ হয়েছেন আরো ১০ জন। এরমধ্যে নিহত একজনের পরিচয় এখনো মেলেনি। রোববার সকাল ৯টার দিকে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। আহতদের উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ৪ জন পুরুষ, দু’জন নারী ও একজন শিশু রয়েছে। চমেক হাসপাতালের পুলিশ ফাঁড়ির এএসআই আলাউদ্দিন শিকদার জানান, পাথরঘাটায় বিস্ফোরণের পর সকাল থেকে ৭ জনের মরদেহ আনা হয়েছে। আহত ১০ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
বিস্ফোরণে দেয়াল ধসে মূলত নিহত ও আহতের ঘটনা ঘটেছে।

নিহতদের মধ্যে ৬ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন-কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার আবদুল হামিদের ছেলে নুরুল ইসলাম (৩১), পটিয়ার মেহেরআটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা অ্যানি বড়ুয়া (৪০), রাঙ্গুনিয়া উপজেলার কাজল নাথের মেয়ে কৃষ্ণকুমারী স্কুলের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী অর্পিতা নাথ (১৬), নতুন ব্রিজ এলাকার শ্রমিক নুরুল ইসলাম (৩০), পাথরঘাটার জুলেখা খানম ফারজানা (৩০) ও তার ছেলে আতিকুর রহমান (৮)।
কোতোয়ালি থানার ওসি মো. মহসিন জানান, ভবনটির গ্যাসের পাইপ লাইনের রাইজার বিস্ফোরণে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে দ্রুত পৌঁছে চট্টগ্রাম আগ্রাবাদ ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট কাজ শুরু করে।

আগ্রাবাদ ফায়ার সার্ভিসের উপ-সহকারী পরিচালক পূর্ণচন্দ্র মুৎসুদ্দী জানান, রোববার সকাল ৯টার দিকে পাথরঘাটা ব্রিকফিল্ড রোডের কুঞ্জমনি ভবনে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। বিস্ফোরণের পর ওই ভবনের সামনের দুটি দেয়াল ধসে পড়ে। এতে চাপা পড়া ১৭ জনকে উদ্ধার করে চমেক হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

স্থানীয় লোকজন জানান, শনিবার রাত থেকে কুঞ্জমনি ভবনের নিচ দিয়ে টানা গ্যাসের পাইপ লাইন মেরামতের কাজ চলছিল। রোববার সকালেও কাজ চলাকালীন সময়ে হঠাৎ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এ সময় চারপাশে আগুন লেগে যায়। ভবনের দুটি দেয়াল ধসে পড়ে লোকজন চাপা পড়ে।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক ফয়সাল কবির বলেন, নিহত সাতজনের অধিকাংশ মাথায় আঘাত পেয়েছেন। এ কারণে তাদের মৃত্যু হয়েছে। আহতদের অবস্থাও ভালো নয়। এর মধ্যে হানিফ নামে একজনের অবস্থা গুরুতর।
উদ্ধারকাজ করে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে আবু তালেব
চট্টগ্রাম মহানগরীর পাথরঘাটায় ধনা বড়ুয়ার কুঞ্জমনি ভবনে গ্যাস লাইন বিস্ফোরণে নিহত ও আহতদের উদ্ধারকাজ করে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে লড়াই করছেন আবু তালেব (৪৫)।
ঘটনার ভয়াবহতা থেকে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি বর্তমানে চমেক হাসপাতালের ১২ নম্বর হৃদরোগ ওয়ার্ডের সিসিইউতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। আবু তালেব পাথরঘাটার ব্রিকফিল্ড রোডের আব্দুল জব্বারের ছেলে। কুঞ্জমনি ভবনের পার্শ্ববর্তী বারমাস নামে একটি কসমেটিক দোকানের কর্মচারী সে।
তার স্ত্রী আয়েশা বেগম বলেন, গ্যাস লাইন বিস্ফোরণ হয়েছে আমাদের বাড়ি থেকে ৩০ গজের মধ্যে। বিস্ফোরণের আওয়াজ শুনে আমার স্বামী বাড়ি থেকে বের হন। আমাদের প্রতিবেশী আব্দুল হামিদসহ ৭ জনের মরদেহ উদ্ধার করে এম্বুলেন্সে তুলে দেন তিনি।

নিহত ও আহতদের উদ্ধার শেষে বাড়িতে গিয়ে কয়েক মিনিটের মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়েন। সারা শরীরে ঘাম দিয়ে অবস্থার অবনতি হতে থাকে। এরপর তাকে চমেক হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়।
চমেক হাসপাতালের হৃদরোগের বিভাগীয় প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক প্রবীর কুমার দাশ বলেন, নিহত ও আহতের মতো মর্মান্তিক ঘটনা দেখে অনেক সময় হার্ট অ্যাটাক হয়। আবু তালেবেরও হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। তিনি বর্তমানে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন।  

চমেক হাসপাতালের উপ-সহকারী পরিচালক ডা. হুমায়ুন কবির বলেন, গ্যাস লাইন বিস্ফোরণে নিহত ও আহতদের উদ্ধার করার পর আবু তালেব নামে এক ব্যক্তি নিজেও অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি চমেক হাসপাতালে ভর্তি আছেন। তাকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা দেয়া হচ্ছে।
হৃদরোগ ওয়ার্ডের সিনিয়র নার্স সুমি বলেন, হৃদরোগ ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন আবু তালেবের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
বিস্ফোরণে তছনছ মঞ্জু মিয়ার জীবিকার চাকা
গ্যাস লাইনের লিকেজ থেকে বিস্ফোরণ ঘটা কুঞ্জমনি ভবনের পাশে চার তলাবিশিষ্ট বাদশা মিয়া ভবনের নিচে ২০ বছর চা আর পান বিক্রি করতেন মঞ্জুর হোসেন (৫০)। ভবনটির নিচতলায় জনতা ফার্মেসির পাশে বসে ব্যবসা করতেন তিনি।

কিন্তু বিস্ফোরণের ঘটনায় তছনছ হয়ে গেছে মঞ্জু মিয়ার জীবিকার চাকা। দোকান ভেঙে নিচে চাপা পড়েন তিনি। এতে প্রাণে বেঁচে গেলেও দুটি হাত আর পায়ে আঘাত পেয়েছেন তিনি। পরে স্থানীয়রা উদ্ধার করে পার্শ্ববর্তী একটি ফার্মেসিতে নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা করান তাকে।
বিস্ফোরণে সহায় সম্বল হারিয়ে পরিবারকে নিয়ে দুশ্চিন্তা আর হতাশায় ভেঙে পড়েছেন তিনি। কান্নায় ভেঙে পড়ে তিনি বলেন, অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে গেলেও আমার দোকানটি তছনছ হয়ে গেছে। বিকট একটা আওয়াজের পর মুহূর্তেই আমার সবকিছু শেষ হয়ে গেছে।

তিনি বলেন, তখন আমি দোকানের ভেতর ছিলাম। বিস্ফোরণে দোকান ভেঙে আমি তার নিচে চাপা পড়ে যাই। পরে লোকজন এসে আমাকে বের করেন। সামনে গিয়ে দেখি সিঁড়ির পাশে রিকশার ড্রাইভার আর আরেকজন যাত্রী পড়ে আছে। এ সময় একজন মা আর আরেকটা শিশুসহ আমার চোখের সামনেই ৭টি দেহ পড়ে থাকে।
তিনি আরো বলেন, পার্শ্ববর্তী একটি গলিতে বৃদ্ধা মা, সহধর্মিণী আর ৩ ছেলেকে নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছি আমি। তিন ছেলের মধ্যে আরাফাত হোসেন নগরীর নোমান কলেজে অনার্সে, মেজো ছেলে আমজাদ হোসেন সোবহানিয়া মাদ্রাসায় নবম জামাতে পড়ছে। ছোট ছেলে আবির তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ছে। আর আমার পরিবার চালানোর একমাত্র সম্বল ছিল দোকানটি। বিস্ফোরণে দোকানে থাকা ৩০ হাজার টাকার মালামাল নষ্ট হয়ে গেছে।

সবার চোখে-মুখে বিস্ফোরণের আতঙ্ক:
পাথরঘাটার ব্রিকফিল্ড রোডে কুঞ্জমনি ভবনে গ্যাস লাইন বিস্ফোরণের আতঙ্ক সবার চোখে-মুখে। পার্শ্ববর্তী জনতা ফার্মেসির কর্মচারী অনুপম ঘোষের হাত-পা কাঁপুনি যেন থামছেই না।
 রোববার বিকালে দুর্ঘটনাস্থলের কাছে দাঁড়িয়ে কথা হয় অনুপম ঘোষের সঙ্গে। বিস্ফোরণের ভয়াবহতার নিদর্শন তখনো আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। জানতে চাইলে অনুপম বলেন, মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরেছি। ভয়াবহ ঘটনা। মনে করতে চাই না।

জনতা ফার্মেসির মালিক যীশু নাথ বলেন, কর্মচারী দোকান খুলেছে। আমি একটু দূরে ছিলাম। দোকানে আসছিলাম। হঠাৎ শুনি বিকট শব্দ। কেঁপে ওঠে চারদিক। দৌড়ে গিয়ে দেখি আমার দোকানে ঢুকে গেছে পাশের ভবনের দেয়াল।
শুধু দেয়াল না, ভবনটির ফটকসহ এসে পড়ে। রাস্তায় থাকা রিকশা এবং পথচারীরাও চাপা পড়ে এই দেয়ালের নিচে। ফায়ার সার্ভিস উদ্ধারকাজ চালিয়ে হতাহত লোকজনকে উদ্ধার করে।

তিনি বলেন, কুঞ্জমনি ভবন এবং বাদশা মিয়া ভবনের মাঝখানে প্রায় ২০ ফুটের একটি সড়ক। এই সড়ক দিয়ে যান চলাচল করছিল। ছিল পথচারীরাও। এ সময় একটি রিকশারোহী দুই নারীর নিথর দেহ আমার দোকানের ভেতরে গিয়ে পড়ে। কী ভয়াবহ অবস্থা।

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর