× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনরকমারিপ্রবাসীদের কথাবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ঢাকা সিটি নির্বাচন- ২০২০ষোলো আনা মন ভালো করা খবর
ঢাকা, ২২ জানুয়ারি ২০২০, বুধবার

ওস্তাদ দবিরের আজো মেলেনি মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি

বাংলারজমিন

প্রতীক ওমর, বগুড়া থেকে | ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯, রবিবার, ৮:৩৮

এক নামে তাকে চিনতেন মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়া যোদ্ধারা। তার কাছে প্রশিক্ষণ নিয়ে অস্ত্র হাতে লড়েছেন অসংখ্য যোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক অনেক বইয়ে তিনি ও তার কাজ স্থান পেয়েছে। রণকৌশলী প্রশিক্ষক এই মহান মানুষটির নাম দবির উদ্দিন আহম্মেদ। যুদ্ধের সময় তাকে সবাই ডাকতো ওস্তাদ দবির বলে।
বগুড়ায় জন্ম নেয়া দবির উদ্দিন মুক্তিযুদ্ধের আগে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে সুবেদার মেজর হিসেবে কর্মরত ছিলেন। যুদ্ধের সার্বিক কৌশল আয়ত্তে ছিল তার। ওই সময় পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়সী দবির উদ্দিন বাঙালি সাধারণ যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণের জন্য উজাড় করে দেন নিজেকে। বয়সের দিকে না তাকিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন যুদ্ধের মাঠে।
৭ নম্বর সেক্টরের অধীনে তিনি প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি সম্মুখযুদ্ধেও অংশ নেন। বগুড়াসহ দেশের প্রায় সব মুক্তিযোদ্ধার কাছে তিনি এখনো ওস্তাদ দবির নামে খ্যাত। অথচ দেশ স্বাধীনের ৪৮ বছর পেরিয়ে গেলেও এই ওস্তাদ এখনো পাননি যোদ্ধার সরকারি স্বীকৃতি।

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে সম্মানিত করেছে। পাশাপাশি গোটা দেশে বাদ পড়া যোদ্ধাদের খুঁজে বের করে তাদের স্বীকৃতি দিয়েছে কয়েক দফায়। ওস্তাদ দবিরের ছোট মেয়ে শামীম আরা আহম্মেদ জয়া ঢাকা ও বগুড়ার দপ্তরে দপ্তরে ঘুরেও তার বাবার স্বীকৃতি নিতে পারেননি আজও।

বাবার স্বীকৃতির জন্য ২০১১ সালের ২০ ডিসেম্বর তৎকালীন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী এবং বগুড়ার জেলা প্রশাসক বরাবরে আবেদনসহ মুক্তিযোদ্ধা সংসদে ঘুরেছেন দিনের পর দিন। কিন্তু ফল হয়নি কোনো। ওস্তাদ দবিরের ছোট মেয়ে শামীম আরা জয়া জানান, ১৯৭৯ সালে বাবা মারা যাওয়ার পর তার ব্যক্তিগত কাগজপত্রের ফাইল থেকে পাওয়া যায় মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের বেশ কিছু নিদর্শন। ভারত সরকারের পুনর্বাসন দপ্তরের পতিরাম ইয়ুথ ক্যাম্পের দেয়া রিলিজ আদেশ স্লিপ, ৭৭ সালে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ বগুড়া সদর ইউনিট কমান্ডারে প্রত্যয়নপত্র, সেখানে উল্লেখ ছিল তিনি জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ফাউন্ডার এবং প্রথম আহ্বায়ক। তার এমএফ নং পিজি-৬৯৫০২, সাব মেজর সেক্টর নং ০৭।
যুদ্ধের সময় ভারতের পশ্চিম দিনাজপুরে পতিরাম ইয়ুথ ক্যাম্পে সে সময়ের ভারতীয় জেনারেল অরোরার সঙ্গে তার সাক্ষাতের প্রমাণ মেলে বিভিন্ন বইয়ে।

বগুড়া জেলায় সব মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি মিললেও এখনো ফাইলবন্দি আছে যোদ্ধাদের প্রশিক্ষক ওস্তাদ দবির আহম্মেদের স্বীকৃতি। মহান বিজয়ের এই মাসে তার ছোট মেয়ে শামীম আরা জয়া বাবার স্বীকৃতি সরকারিভাবে দেওয়ার জন্য দাবি জানান।

ডা. আরশাদ সায়ীদের লেখা ‘আমার অনেক ঋণ আছে’ বইয়ে ওস্তাদ দবির উদ্দিনের নাম অনেক জায়গায় উল্লেখ আছে। ডা. আরশাদ লিখেছেন: ‘বগুড়ার সেন্ট্রাল স্কুল ট্রেনিং সেন্টার গড়ে ওঠে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য। এ রকম ট্রেনিং সেন্টার মালতি নগর স্কুলে, করনেশন স্কুলেও হয়েছে। সেন্ট্রাল স্কুলে ট্রেনিং সেন্টারের পরিচালনায় ছিলেন আবু সুফিয়ান। (যাকে পাকবাহিনী জয়পুরহাটের ক্ষেতলালে হত্যা করে)। ডীপু, ওয়ালেস ভাইও ওই ট্রেনিং সেন্টারের সাথে ছিলো। ওয়ালেস ভাই আমায় ডেকে নেন। আব্বার অনুমতি উনি জোর করে আদায় করেন। যেয়ে দেখি প্রায় ৭০ জন ছেলে ট্রেনিং নিচ্ছে। ট্রেনিং দিচ্ছেন সুবেদার মেজর ওস্তাদ দবির উদ্দিন, হাবিলদার মেজর রেজাউল করিম ও বুলু চাচা।’

ওস্তাদ দবির উদ্দিনকে নিয়ে অনেক স্মৃতিচারণা আছে ‘আমার অনেক ঋণ আছে’ বইটিতে। বইটির অ্যালবামেও ওস্তাদ দবির উদ্দিনের প্রশিক্ষণকালীন ছবি ছাপা হয়েছে। ওই বইয়ে ওস্তাদ দবির সম্পর্কে আরো উল্লেখ আছে- ‘ওস্তাদ দবির উদ্দিন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বার্মা ফ্রন্টে যুদ্ধ করেছিলেন মিত্রবাহিনীর পক্ষে। উনি অফিসারসহ গাড়ি চালিয়ে নিয়ে বার্মায় ক্যাম্প থেকে যে সময় বেরিয়ে যান ঠিক সেই মুহূর্তে জাপানি বিমান বোমা মেরে ওই ক্যাম্প ধ্বংস করে। অল্পের জন্য উনারা বেঁচে যান’।

মুক্তিযোদ্ধা নজমল হক খানের বয়ানে ওস্তাদ দবির, ‘ওনার সাথে আমার পরিচয় কামারপাড়া ইয়ুথ ক্যাম্পে। উনি ছিলেন ইয়ুথ ক্যাম্পের ওস্তাদ। অনেক লম্বা একটা মানুষ ছিলেন উনি। অনেক বড় গোঁফ ছিল। তিনি পাকিস্তান আর্মিতে ছিলেন। অবসরে যাওয়ার পরে তিনি নাটক করতেন। আমরা যে ক্যাম্পে ছিলাম, সেটা ছিল ভারতের বালুঘাটের কামারপাড়ায়। ওখানে যুবকরা একত্র হতো। সেখানে প্রাথমিক ট্রেনিং দেয়া হতো তাদের। ওখান থেকে ট্রেনিং শেষে ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় পাঠানো হতো এসব যুবককে। ওখানকার সেই ট্রেনিংটা দিতেন ওস্তাদ দবির উদ্দিন। আমরা ওনার ভেতর আর্মির পুরো প্যাটার্ন দেখেছি। বালুঘাটের ওই ক্যাম্পে রেজাউল করিম নামের একজন ছিলেন। আমরা তাকে টিক্কা খান বলে ডাকতাম। উনি ও ওস্তাদ দবির দু’জন মিলে ট্রেনিং করাতেন। ওই ট্রেনিং করার পুরো সময়েই তার সঙ্গে ছিলাম আমি।’

ট্রেনিং শেষে যুদ্ধে চলে যান নজমল হক খান। এরপর তার সঙ্গে আর সাক্ষাৎ হয়নি। মুক্তিযোদ্ধা নজমল বলেন, ‘আমার চাকরি হয়। চাকরিতে চলে যাই।’ তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমাদের ওস্তাদ হয়েও আজও তিনি মুক্তিযুদ্ধের স্বীকৃতি পাননি, এটা জানার পর খুব কষ্ট পেয়েছি।’ দবির উদ্দিনের স্বীকৃতি না পাওয়ার পেছনে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদের অবহেলার দায়ও দেখছেন তিনি।

সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী আবু সাইয়িদের বইয়ে ওস্তাদ দবির মুক্তিযুদ্ধের সময় যেসব মুক্তিযুদ্ধ শিবির গড়ে তোলা হয়েছিল তার অন্যতম ছিল কুরমাইল ক্যাম্প। ওই ক্যাম্পের দায়িত্বে ছিলেন অধ্যাপক আবু সাইয়িদ। তার সম্পাদনায় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসভিক্তিক বই ‘অনির্বাণ’-এর বিভিন্ন জায়গায় ওস্তাদ দবির উদ্দিনের কথা আছে। ওই বইয়েও তাকে ওস্তাদ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই বইয়ে লেখা হয়েছে, যুদ্ধ ক্যাম্পে আগত মুক্তিযোদ্ধাদের টানা প্রশিক্ষণ দিয়েছেন ওস্তাদ দবির উদ্দিন।

অধ্যাপক আবু সাইয়িদের বইয়ে মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ কিছু বাছাই ছবি ছাপা হয়েছে। সেখানে স্থান পেয়েছে ওস্তাদ দবির উদ্দিনের ছবিও। ছবিতে দেখা যায়-ভারতের তৎকালীন লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার সঙ্গে প্রশিক্ষণ ও অপারেশন ক্যাম্পের কর্মকর্তা ও প্রশিক্ষকদের পরিচয় করে দিচ্ছেন সাবেক ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সদস্য ওস্তাদ দবির উদ্দিন। এসব নথিপত্র সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরে জমা দিয়েছেন ওস্তাদ দবিরের ছোট মেয়ে শামীম আরা আহম্মেদ জয়া। সব দপ্তরে কর্মকর্তাদের মুখে শুনেছেন তার বাবার নাম। অথচ আজও তিনি যোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পাননি।

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর