× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনরকমারিপ্রবাসীদের কথাবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা মন ভালো করা খবরকরোনা আপডেট
ঢাকা, ৫ এপ্রিল ২০২০, রবিবার

অবিন্তার স্বপ্ন এগিয়ে নিচ্ছে ওরা

মন ভালো করা খবর

কাজল ঘোষ | ২৩ ডিসেম্বর ২০১৯, সোমবার, ৪:১৩

বাড্ডা নতুন বাজার। ফুটপাথে ছোট্ট একটি চায়ের দোকান। দোকানটি রহিমা খাতুনের। স্বামী আব্দুল মান্নান মারা গেছেন। পরিবারের আয়-রুজি বলতে ভরসা রহিমা খাতুনই। চা বিক্রির টাকায় কোনোমতে দিন চলে। মেয়ে হাবীবা নূরী বড় হচ্ছে। কীভাবে মানুষ করবেন? নানা চিন্তা।
খাবারই জোটে না। সেখানে পড়াশোনা। চোখে অন্ধকার দেখে রহিমা। অন্ধকার জগতের হাতছানি বস্তির চারপাশে। কি করবেন হাবীবাকে নিয়ে রহিমা?

নতুন বাজারেরই আরেকটি ঘটনা। রিকশার গ্যারেজ। ভাঙা আর পুরনো রিকশার জটলা। ধুলো-ময়লায় ছেঁয়ে যাওয়া। গ্যারেজের এক কোনে চলে রান্না। কাটা আর বাটা করছেন নূর নাহার। গ্যারেজের বান্ধা কাজের মানুষ। রিকশাচালক আর মিস্ত্রিদের খাবার রান্না করেন তিনি। অল্প একটু জায়গা। এখানেই রান্না আর এখানেই রাত কাটান মা-মেয়ে। মেয়ে রিতা বড় হচ্ছে। নূর নাহারের আকাশ অন্ধকারে ছেয়ে আছে। কীভাবে মেয়েকে মানুষ করবেন এ ভাবনাই। এতটুকুন আলোর সন্ধান কীভাবে পাবেন রিতার জন্য। যেখানে দু’বেলা খাওয়া জোটে না সেখানে আবার পড়া।
আরেকটি ঘটনা। নাম তার আলো। পুরো নাম সুরমা আক্তার আলো। বাস ভাটারার এক বস্তিতে। বাবা কবীর সরকার রিকশা চালান। মা তাসলিমা আক্তার বাসায় ঝিয়ের কাজ করেন। আলোসহ ওরা চার ভাইবোন। এতটাই গরিব যে, দুজন কাজ করেও সংসার চলছে না। ঠিকমতো খাবারই জুটছে না। আগে বাঁচা তারপর পড়াশুনা। আলো শুধু নামেই আলো। কিন্তু তার জীবন অন্ধকারে ঠাসা।

হাবীবা। রিতা। আলো। তিনজনই আলোর সন্ধান পেয়েছেন। তাদের মুখে হাসি ফোটাতে এগিয়ে এসেছে কয়েকজন আপু। যারা তাদের দায়িত্ব নিয়েছে। শুধু পড়াশুনা নয় তাদের খাবার দিচ্ছে, ডাক্তার দেখাচ্ছে, খেলাধুলায় পাশে থাকছে। তাদের মানুষের মতো মানুষ করে গড়ে তুলছে। আর তাদের জীবনের অন্ধকার দূর করতে আলো হাতে এগিয়ে এসেছে একটি ফাউন্ডেশন। নাম অবিন্তা কবীর ফাউন্ডেশন। মেধাবী শিক্ষার্থী অবিন্তা নিহত হয় হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলায়। অবিন্তার স্বপ্ন ছিল সুবিধাবঞ্চিত মেয়ে শিশুদের নিয়ে কিছু করার। তার স্বপ্নের বাস্তবায়নে যাত্রা এই স্কুলের। হাবীবা, রিতা, আলো শুধু এই তিনজন নয় বর্তমানে প্রায় শতাধিক সুবিধাবঞ্চিত শিশুর মুখে হাসি ফুটিয়েছে এই ফাউন্ডেশন। তাদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, খাদ্য তিনটির দায়িত্বই নিয়েছে এরা। পিছিয়ে পড়া জীবনকে আলোকিত করতে, স্বপ্ন দেখাতে, সাফল্যের মুখ দেখাতে নিভৃতে কাজ করে চলেছে অবিন্তা কবীর  ফাউন্ডেশন।

একজন অবিন্তা কবীর ও ফাউন্ডেশন: এক মর্মান্তিক অধ্যায়। ২০১৬ সালের ১লা জুলাই হলি আর্টিজানে যে নিরপরাধ ২০ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন একদল বিভ্রান্ত জঙ্গির হাতে। অবিন্তা অকালে প্রাণ যাওয়া তাদেরই একজন। যুক্তরাষ্ট্রের অ্যামোরি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থী অবিন্তা কবীর ছিলেন স্বপ্নচারী মানুষ। যেখানেই ছিলেন তার মনে ছিল বাংলাদেশ। তারুণ্য ছিল তার শক্তি। অত্যন্ত প্রাণবন্ত, মানবিক ও চিন্তাশীল অবিন্তার স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে এনজিও গড়বেন। সুবিধাবঞ্চিত মেয়ে শিশুদের শিক্ষা বিস্তারে কাজ করবেন। তার লেখায়, কথায় আর নানা সমাজসেবামূলক কাজে যুক্ত থেকে সেই স্বাক্ষরও রেখে গেছেন। মেধাবী শিক্ষার্থী অবিন্তা দেশে ও দেশের বাইরে বিভিন্ন সমাজ সেবামূলক সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। হ্যাবিটেট ফাউন্ডেশন, জাগো ফাউন্ডেশনে স্বেচ্ছায় নানান কর্মসূচিতে অংশ নেয়া সেই সাক্ষ্যই বহন করে।

অবিন্তার মা রুবা আহমেদের লেখা থেকে জানা যায়, অবিন্তার জন্ম বাংলাদেশে এবং ওর ১৯ বছরের জীবনের বেশির ভাগ সময় কেটেছে ঢাকায়। অবিন্তার বয়স যখন দেড় বছর তখন আমরা আমেরিকার মায়ামী শহরে চলে যাই, সেখানে ও ক্লাস ফোর পর্যন্ত পড়াশুনা করে। স্কুলে থাকাকালীন অবস্থায় অবিন্তা ওর বন্ধু ও শিক্ষকদের বাংলাদেশের সভ্যতা, সংস্কৃতি পরিচয় করিয়ে দেয়াটা দায়িত্ব মনে করতো। ২০০৭ সালে আমরা বাংলাদেশে ফেরত চলে আসি। ঢাকার আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল স্কুল থেকে পড়াশুনা শেষ করে ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যামেরিতে পড়াশুনা করতে চলে যায়। এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০১৬ সালের জুন মাসে এচঅ ৩.৯৮ পেয়ে অবিন্তা ওর কলেজের প্রথম বছর শেষ করেছিল। অবিন্তা স্কুল এবং কলেজের বিভিন্ন প্রজেক্টে দেশের প্রতি ওর দায়িত্বের কথা লিখে গিয়েছিল।

“I am acutely sensitive to the tremendous hardship faced by the ordinary people of May Country and also understand that these hardships are a result of maû centuries unplanned growth, strong prejudice and lack of education. I understand the importance of embracing May nation for what it is and work every way that I can improve the quality of life of its people. I believe that it’s my responsibility as a Bangladeshi to help those in need.”  

অবিন্
 
তার স্বপ্ন ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশুনা শেষ করে বাংলাদেশে একটি এনজিও খুলবে সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের সাহায্য করবে। আমার মেয়ে তার স্বপ্ন পূরণ করে যেতে পারেনি। তার এই স্বপ্নকে সামনে রেখে অবিন্তা কবীর ফাউন্ডেশনের যাত্রা শুরু ২০১৭ সালের মার্চ মাস থেকে।

অবিন্তার স্বপ্ন এগিয়ে নিচ্ছে ওরা: দরিদ্র মেয়ে শিশুদের নিয়ে ভাবনা ছিল অবিন্তার। অবিন্তার সেই স্বপ্নকে এগিয়ে নিচ্ছে অবিন্তা কবীর ফাউন্ডেশন। সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে ঢাকার ভাটারায় এই স্কুলের যাত্রা শুরু হয় ২০১৭ সালের ৫ই জুলাই। প্রথম বছর শিক্ষার্থী ছিল মাত্র ষোলজন। বছর পাড় হচ্ছে আর শিক্ষার্থী বাড়ছে। স্কুলের নিয়ম হচ্ছে একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে যা যা প্রয়োজন তাই দেয়া হয়ে থাকে ফাউন্ডেশন থেকে। পরিচ্ছন্নতা থেকে শুরু করে সাজগোজ, খেলা থেকে সঙ্গীত, নৃত্য থেকে ছবি আঁকা সবই ব্যবস্থা রয়েছে অবিন্তা কবীর ফাউন্ডেশন স্কুলে।

অবিন্তা কবীর ফাউন্ডেশন স্কুলে একদিন: নামটি শুনেছি। কিন্তু কখনও যাওয়া হয়নি। হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলায় মর্মান্তিক মৃত্যুর পর দেশজুড়ে যাদের জন্য মানুষ কেঁদেছে অবিন্তা তাদেরই একজন। তার স্বপ্ন বাস্তবায়নে কাজ করছে যে স্কুল তা প্রত্যক্ষ করার উদগ্র ইচ্ছে নিয়ে ছুটে যাই ভাটারায়। সেখানকার একশো ফিটের মাদানী অ্যাভিনিউতে অবস্থিত স্কুলটির কার্যক্রম বাইরে থেকে বুঝে ওঠার উপায় নেই। সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় গেলেই এর কার্যক্রম স্পষ্ট হলাম। বর্তমানে প্রি প্লে থেকে শুরু করে তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষার্থী রয়েছে। পুরো স্কুলটি দেখে মনে হচ্ছিল যেন একটি আর্ট গ্যালারি। নানান রঙের বাচ্চাদের মোটিফ দিয়ে সাজানো পুরো স্কুল। রয়েছে একটি সুন্দর পাঠাগার। যেখানে দেশ বিদেশের শিশুবিষয়ক কয়েক হাজার বই শিক্ষার্থীরা পড়ার সুযোগ পায়।

যেভাবে শিক্ষার্থীদের বাছাই করা হয়: শিক্ষার গুনগতমান বা কোয়ালিটি এডুকেশনই বড় বিষয় এই স্কুলে। ফাউন্ডেশন পরিচালিত আর্ট গ্যলারির কিউরেটর সুলতান এম মাইনুদ্দিন, ফাউন্ডেশনের জনসংযোগ প্রধান ফারখুন্দা আহমেদ জানালেন স্কুল পরিচালনার আদ্যপান্ত। খুব সীমিত সংখ্যায় শিক্ষার্থীদের এখানে নেয়া হয়। যারা এখানে সুযোগ পায় তারা সত্যিকার অর্থে সুবিধাবঞ্চিত কিনা তা নিয়ে চলে অনুসন্ধান। বছরের নির্ধারিত সময়ে আবেদনপত্র প্রাপ্তির পর মাঠ পর্যায়ে খোঁজ নেয়া দেয়া হয় তাদের পারিবারিক অবস্থা কেমন? যেখানে বাস করে সেখানকার পরিবেশ ও জীবনধারণ পদ্ধতি কেমন? আদৌ তার সহযোগিতা প্রযোজন আছে কিনা? সব ধরণের খোঁজ খবর শেষে ষোলজন শিক্ষার্থীকে বাছাই করা হয়। প্রশ্ন ছিল ষোলজন কেন? কর্মকার্তারা জানালেন, সবরকম সুবিধার যথাযথ প্রয়োগেই এ পরিমাণ শিক্ষার্থীর বাইরে এখনও অতিরিক্ত নেয়া হয়না। চ্যলেঞ্জ অনুভব করেন কোথায় কোথায়? এ প্রশ্নে জানালেন, চ্যালেঞ্জিং নানা কারণে। যাদেরকে আমরা বাছাই করি তারা কেউ বাসায় গিয়ে পড়ে না। আসলে বাসায় তাদের সে পরিবেশ নেই। দেখা গেছে, একটি পথশিশুকে সঠিক যত্ন নিতে পারলে সে খুব দ্রুত ইমপ্রুভ করে। কারণ, এখানে সবকিছুর ব্যবস্থা করা হয়।

শেষ কথা: স্বপ্ন দেখানো। স্বপ্ন দেখতে শিখলেই মানুষ বাঁচতে শিখে। অবিন্তার এই স্বপ্নই ছড়িয়ে দিতে কাজ করে যাচ্ছে অবিন্তা কবীর ফাউন্ডেশন স্কুল।

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর