× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনরকমারিপ্রবাসীদের কথাবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা মন ভালো করা খবরকরোনা আপডেট
ঢাকা, ৫ এপ্রিল ২০২০, রবিবার

মুক্তিযুদ্ধে স্যার ফজলে হাসান আবেদ

বই থেকে নেয়া

অনলাইন ডেস্ক | ২৩ ডিসেম্বর ২০১৯, সোমবার, ৫:২৬

মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে লন্ডন থেকে কলকাতায় ছুটে এসেছিলেন স্যার ফজলে হাসান আবেদ। খোঁজ নিয়েছিলেন রণাঙ্গণের যোদ্ধাদের। সাক্ষাৎ করেছেন তাজউদ্দিন আহমদের সঙ্গেও। কথা বলেছিলেন কিভাবে সহযোগিতা করা যায় মুক্তিযোদ্ধাদের। গোলাম মোর্তোজা প্রণীত ‘ফজলে হাসান আবেদ ও ব্র্যাক’ বইতে দেয়া দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে সেই সময়ের স্মৃতিচারণার চুম্বক অংশ প্রকাশিত হলো মানবজমিনের পাঠকদের জন্য।

‘নিউজ উইক’-এ ঐ প্রতিবেদন প্রকাশের পূর্ব পর্যন্ত আমরা প্রচারমূলক কাজ করছিলাম। দুর্ভিক্ষের আশঙ্কার কথা শুনে ভাবলাম, আমাদের কার্যক্রম শুধু প্রচারের কাজে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। মুক্তাঞ্চল বিশেষ করে সীমান্ত এলাকাগুলোতে সাহায্য পাঠানো গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
এতদিন আমরা ‘অ্যাকশন বাংলাদেশ’ সংগঠনের ব্যানারে কাজ করছিলাম। এবার আমরা যে সংগঠনটি গড়ে তুললাম, তার নাম ‘হেলপ বাংলাদেশ’। সত্তরের ঘূর্ণিঝড়ের পর, মনপুরাতে কাজ করার সময় আমাদের সংগঠনের নাম ছিল ‘হেলপ’। সেটা তৈরি করেছিলাম পূর্ব পাকিস্তানের মাটিতে বসে। এবার আরেকটু সম্প্রসারিত করে নাম দিলাম ‘হেলপ বাংলাদেশ’।
এভাবেই বিদেশের মাটিতে বসে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য আমাদের সংগঠন তৈরি হল। স্বাধীনতাযুদ্ধে সহায়তার লক্ষ্যে আমরা অর্থসংগ্রহ করতে লাগলাম।

ভাবতে লাগলাম, মুক্তিযুদ্ধে আমরা সরাসরি কীভাবে অবদান রাখতে পারি। অনেক লোকজনের সঙ্গে দেখা করলাম। পূর্বাপর সকল বিষয় নিয়ে তাঁদের সঙ্গে বিশদ আলোচনা হল। আমি এবং ভিকারুল ইসলাম চৌধুরী লন্ডনস্থ সোভিয়েত দূতাবাসে গেলাম। সোভিয়েত সরকার ও জনগণ মুক্তিযুদ্ধে আমাদের কীভাবে সহায়তা করতে পারে, সেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হল।
লন্ডনে আমাদের সঙ্গে একটা গ্রুপের পরিচয় হল। তাঁরা ভিয়েতনামের পক্ষে ভাড়াটে যোদ্ধা হিসেবে কাজ করেছেন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এরকম গ্রুপ আছে, যারা চরম প্রতিকূল অবস্থানেও একটি দেশে গিয়ে মারাত্মক কোনো ঘটনা ঘটাতে পারে। তারা খুবই সাহসী এবং দক্ষ হয়। নির্ভুল নিশানায় অব্যর্থ আঘাত হানতে পারে তারা। ভিয়েতনামের পক্ষে যুদ্ধ করা গ্রুপটির সঙ্গে আমাদের আলোচনা চলতে থাকল।
এদের দুজন ইংরেজ এবং একজন অস্ট্রেলিয়ান। আমাদের পক্ষ হয়ে নাশকতামূলক তৎপরতা চালাবেন তাঁরা। তাঁদেরকে বললাম, পাকিস্তানের সমুদ্রবন্দরে বা অন্য কোনো জাহাজে যদি বোমা বিস্ফোরণ ঘটানো যায় তাহলে বড় একটা কাজ হয়।
এই তিনজন একদিন আমার বাসায় এলেন। আমি এবং ভিকারুল ইসলাম চৌধুরী তাঁদের সঙ্গে আলাপ করলাম। তাঁরা বললেন, ‘আমরা গুজরাট উপকূল থেকে মাছধরা ট্রলার নিয়ে করাচি সমুদ্রবন্দরে যাব। সেখানে জাহাজে বোমা পেতে বিস্ফোরণ ঘটাব। এজন্য আমাদেরকে অর্থ দিতে হবে।’
এ কাজটি সম্পন্ন করতে তাঁদের সঙ্গে ১৬ হাজার ৮০০ পাউন্ডে রফা হল।
কিন্তু এই কাজে এত টাকা খরচ করব কি না, তা নিয়েও ভাবতে থাকলাম। সন্দেহ নেই এরকম একটি নাশকতামূলক কাজ করতে পারলে সেটা বেশ চাঞ্চল্যকর ব্যাপার হবে। বিশ্ব প্রচারমাধ্যমে উঠে আসবে বাংলাদেশ। মুক্তিযোদ্ধাদের শক্তি ও সাহসিকতার প্রমাণ হবে। কিন্তু এ ধরনের একটি ব্যয়বহুল কাজ করব কি না, সেই সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না।
সেপ্টেম্বর মাসে আমি এবং ভিকারুল ইসলাম চৌধুরী কলকাতা গেলাম। প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে দেখা করার জন্য। কলকাতার থিয়েটার রোডে তাঁর অফিসে গেলাম। সন্ধ্যা সাতটার দিকে আমরা তাঁর কক্ষে ঢুকলাম। তিনি একটি চেয়ারে বসে আছেন। পরনে লুঙ্গি-পাঞ্জাবি। তাঁকে আমাদের পরিকল্পনার কথা অবহিত করলাম। বললাম, এর জন্য প্রয়োজনীয় ১৬ হাজার ৮০০ পাউন্ড সংগ্রহ করেছি। শত্রুঘাঁটিতে নাশকতামূলক এই কাজটি করে আমরা বিশ্বকে চমকে দিতে চাই।

মুজিবনগর সরকারের পক্ষে প্রায় সব কাজই তখন করছিলেন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। তিনি বিষয়টিকে কীভাবে দেখেন বা তাঁর অন্য কোনো পরামর্শ বা পরিকল্পনা আছে কি না, তা আমরা জানতে চাইছিলাম। এত বড় একটি কাজ প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী না জানিয়ে আমরা করতে চাই নি। আর এই কাজটি যে মুক্তিযোদ্ধারা করছে সেটা জানিয়ে রাখাও একটি উদ্দেশ্য ছিলো।
আমাদের সব কথা শুনে তাজউদ্দীন আহমদ বললেন, দেখুন, এ ধরনের অভিযান সফল হতে পারে, আবার নাও হতে পারে। তাই এই কাজে এত টাকা ব্যয় করা ঠিক হবে না। আমরা খুবই আর্থিক সঙ্কটের মধ্যে আছি। একেবারেই চলতে পারছি না। ভারত সরকারের উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল আমরা। তাঁরা আমাদের অনেক কিছু দিচ্ছেন, আবার অনেক কিছু দিচ্ছেন না। আপনাদের সংগৃহীত অর্থটা পেলে আমাদের যুদ্ধ আমরা নিজেরা নিজেরাই করতে পারব। ভাড়াটে লোকের প্রয়োজন হবে না।
তাজউদ্দীন আহমদকে সেদিন একজন নিরহঙ্কার, অমায়িক এবং আদর্শবান রাজনৈতিক নেতা হিসেবে মনে হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সংগঠকের দায়িত্বপালন করেছিলেন।
এ সময় ভিকারুল ইসলাম চৌধুরী জানালেন কলকাতায় প্রগতিশীল ছাত্রনেতা রাশেদ খান মেননের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়েছে। তিনি আসন্ন শীতে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ছয় হাজার সোয়েটার সরবরাহের দাবি জানিয়েছেন। রাশেদ খান মেনন বর্তমানে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি।

কলকাতায় আমরা উঠেছিলাম নিউ ক্যালিনওয়ার্থ হোটেলে। সেখানে জিয়াউর রহমান সাহেব একদিন এলেন আমাদের রুমে। এটা ছিল থিয়েটার রোডের মুজিবনগর সরকারের অফিসের উল্টোদিকে। আমি যখন চট্টগ্রামে ‘শেল’ কোম্পানিতে চাকরি করি, তখন জিয়াউর রহমানকে দেখতাম। তাঁর সঙ্গে আমার খুব ভাল পরিচয় বা সখ্য ছিল না। চট্টগ্রামে আমি যে বাড়িতে থাকতাম, জিয়াউর রহমানও তার কাছাকাছি থাকতেন। তখন তিনি মেজর ছিলেন। মুখ চেনা ছিল। মুক্তিযোদ্ধারা কীভাবে যুদ্ধ করছে, তাদের সামগ্রিক অবস্থা কী, পাকিস্তানিদের মনোভাব কী, এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হল।
জিয়াউর রহমান বললেন, দূরবিন থাকলে শত্রু আক্রমণ করার পূর্বে সেটি আন্দাজ করা যায়। কিন্তু আমাদের জন্য দূরবিনের ব্যবস্থা করতে পারেন তাহলে খুব ভাল হয়।

এর আগে তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে কথা বলেই মনে হয়েছিল, বোমা বিস্ফোরণের পরিকল্পনা পরিত্যাগ করে অন্য কিছু করতে হবে। জিয়াউর রহমানের সঙ্গে আলোচনা করেও তা-ই মনে হল। বোমা বিস্ফোরণে অর্থ ব্যয় করার চাইতে মুক্তিযোদ্ধাদের সরাসরি সাহায্য করাটা অনেক বেশি প্রয়োজন বলে মনে হল।
আমি লন্ডনে চলে এলাম। ভিকারুল ইসলাম চৌধুরী থেকে গেলেন কলকাতায়। লন্ডনে এসে অর্থসংগ্রহে নেমে পড়লাম। আমরা সীমান্ত এলাকায় একটি খাদ্যগুদাম তৈরি করতে চাইছিলাম। সেখান থেকে বাংলাদেশের মুক্তাঞ্চলগুলোতে খাবার পাঠানো হবে। খাদ্যগুদাম তৈরি করার জন্য ভারত সরকারের অনুমতির প্রয়োজন ছিল। ভিকারুল ইসলাম চৌধুরী কলকাতায় থেকে অনুমতি সংগ্রহের চেষ্টা করতে লাগলেন। বুঝতে পারছিলাম, অনুমতি পাওয়া যাবে। সুতরাং অর্থসংগ্রহের কাজেই বেশি জোর দিলাম। সবাই সহযোগিতা করতে লাগলেন।
শুধু প্রবাসী বাঙালি নয়, অনেক বিদেশিও সেদিন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের জন্য অকাতরে অর্থ সাহায্য করছিলেন। একজন ব্রিটিশ মহিলা এক পাউন্ড পাঠিয়ে লিখেছিলেন, আগামী দু মাস আমি ডিম খাব না। সেই ডিমের টাকাটা তোমাদের দিলাম। এই মহিলার সঙ্গে আমার কখনও দেখা হয় নি।

বিভিন্ন পত্রিকার মাধ্যমে সাহায্যের জন্য আকুল আবেদন জানাতাম। সেই আবেদনে সাড়া দিতেন বহুসংখ্যক বিদেশি। এভাবে বেশ কিছু অর্থ সংগ্রহ করলাম। কিছু অর্থ পাঠালাম কলকাতায়। কিছু খরচ হল রাশেদ খান মেননের প্রত্যাশিত সোয়েটার কেনার পেছনে। জিয়াউর রহমানের চাওয়া দূরবিনও কিনে পাঠিয়েছিলাম।
আমরা মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম যে, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হবে। ভেবেছিলাম, কমপক্ষে পাঁচ-সাত বছর যুদ্ধ চলবে।
চিন্তা করছিলাম আমাদের ধীরে ধীরে এগোতে হবে।

লন্ডনে একদিন দেখা হল ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর সঙ্গে। ‘হেলপ বাংলাদেশ’ অফিসেই একপাশে জাফরুল্লাহ চৌধুরীও একটুখানি জায়গা দেওয়া হয়েছিল। তিনি আহত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ফিল্ড হসপিটাল স্থাপনের লক্ষ্যে লন্ডনে অর্থসংগ্রহ করছিলেন।
লন্ডনে মার্কিন দূতাবাসের সামনে একদিন একটি পথনাটক করলাম। সেখানে দেখানো হল কীভাবে পাকিস্তানি সেনারা নিরীহ বাঙালিদের হত্যা করছে। ‘অ্যাকশন বাংলাদেশ’, ‘হেলপ বাংলাদেশ’ সবাই মিলেই আমরা এ নাটকের আয়োজন করেছিলাম। এতে অভিনয়ও করেছিল আমাদেরই লোকজন। নাটকটি ব্রিটিশ টেলিভিশনেও প্রচারিত হয়েছিল। আমাদের দু-একজনের সাক্ষাৎকারও প্রচারিত হয়েছিল। এভাবে আমাদের কাজ চলছিল।

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর