× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনরকমারিপ্রবাসীদের কথাবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা মন ভালো করা খবরকরোনা আপডেটকলকাতা কথকতাখোশ আমদেদ মাহে রমজান
ঢাকা, ১ জুন ২০২০, সোমবার
২০ বছর পর

ফের যুদ্ধ প্রস্তুতিতে ইসরাইল-হিজবুল্লাহ

বিশ্বজমিন

বাসেম ম্রো ও জোসেফ ফেডারম্যান | ২১ মে ২০২০, বৃহস্পতিবার, ১০:০২

২০ বছর আগে দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরাইলের শেষ যোদ্ধাদের তাড়িয়েছিল হিজবুল্লাহ গেরিলারা। ২০ বছর বাদে এখন কোনো পক্ষেরই যুদ্ধে জড়ানোর ইচ্ছে নেই। কিন্তু তারপরও প্রস্তুতিতে নিমগ্ন উভয়েই। প্রতিবেশী সিরিয়ায় হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে প্রতিনিয়ত বিমান হামলা চালিয়ে আসছে ইসরাইল। এছাড়া পুনরায় লেবানন দখলে নেওয়ার জন্য নিয়মিত চলছে দেশটির মক অনুশীলন। থেমে নেই হিজবুল্লাহও। তারা তাদের বাহিনীর শক্তিমত্তাও ক্রমাগত বাড়িয়েই চলেছে। উস্কানি দিলে খোদ ইসরাইল দখলে নেওয়ার অভিযান শুরুরও হুমকি দিয়েছে।
এই দুই তিক্ত শত্রু সুযোগ পেলেই একে অপরের বিরুদ্ধে সতর্কতা আর হুমকি জারি করে।

উত্তরাঞ্চলীয় ইসরাইলের এক ঘাঁটিতে হিজবুল্লাহর সঙ্গে কল্পিত যুদ্ধ অনুশীলন করছে দেশটির সেনাবাহিনীর একটি দল। ১ সপ্তাহ ধরে চলমান ওই অনুশীলনের নেতৃত্বে আছেন কর্নেল ইসরাইল ফ্রেডলার। তিনি বলেন, ‘পরবর্তী যুদ্ধের জন্য আমরা খুব সিরিয়াসলি প্রস্তুতি নিচ্ছি। আমরা কোনো সংক্ষিপ্ত পথে যাবো না। কারণ আমরা জানি যে, এই শত্রুকে পরাজিত করতে হলে আমাদেরকে প্রচণ্ড শক্তিশালী হতে হবে।’

আশির দশকে উচ্ছৃঙ্খল অনিয়মিত গেরিলা বাহিনী হিসেবে হিজবুল্লাহর জন্ম। অর্থায়নে শুরু থেকেই ছিল ইরান। উদ্দেশ্য ছিল দক্ষিণ লেবানন দখল করে থাকা ইসরাইলি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করা। দীর্ঘমেয়াদী ওই গেরিলা যুদ্ধে সড়কের পাশে পুঁতে রাখা বোমা ফোটা আর স্নাইপার দিয়ে হত্যা করা, দুইই ছিল নিত্যনৈমিত্যিক ঘটনা। পরবর্তীতে ২০০০ সালের মে মাসে পিছু হটতে বাধ্য হয় ইসরাইল। এরপর ফের ২০০৬ সালে যুদ্ধ করতে আসে ইসরাইল। ফলাফল যদিও ড্র, তবুও মাসব্যাপী ওই যুদ্ধ শেষ না করেই চলে যেতে হয় দেশটিকে। ওই মাসব্যাপী যুদ্ধ ছাড়া সীমান্ত মোটাদাগে শান্তই ছিল এতগুলো বছর। কিন্তু এরই মাঝে লেবাননের সবচেয়ে ক্ষমতাধর সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে হিজবুল্লাহ। হিজবুল্লাহর রাজনৈতিক দল ও মিত্ররাই এখন লেবাননের পার্লামেন্টে আধিপত্য চালাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী হাসান দিয়াবের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রধান সমর্থকই হিজবুল্লাহ।

বৈরুতের আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞানের অধ্যাপক হিলাল খাশান বলেন, ‘স্থানীয়ভাবে হিজবুল্লাহ এখন লেবাননের সবচেয়ে শক্তিশালী বাহিনীতে পরিণত হয়েছে বটে।’ তবে তিনি বলছেন, ইসরাইলি চাপ, আঞ্চলিক রাজনীতিতে অস্থিরতা ও ইরানি পৃষ্ঠপোষকদের অবস্থা খারাপ হওয়ায়, আঞ্চলিকভাবে হিজবুল্লাহর অবস্থান এখন ঝুঁকিতে আছে।

ফলে ইসরাইলের সঙ্গে এখন বড় আকারে যুদ্ধ হলে হিজবুল্লাহর সামলাতে কষ্টই হবে। অপরদিকে লেবানিজ অর্থনীতির করুণ দশা। দেশটির প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যাই এখন দরিদ্র। হিজবুল্লাহর শক্তিশালী অবস্থান যেখানে সেখানেও একই অবস্থা। ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা থাকায় তাদের অর্থায়নও ঝুঁকিতে পড়েছে। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে অংশ নিয়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তাদের। প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের পক্ষে লড়াই করতে গিয়ে প্রায় ২ হাজার সৈন্য হারিয়েছে হিজবুল্লাহ। দেশের ভেতর একসময় হিজবুল্লাহকে দেখা হতো স্বাধীনতা আন্দোলনকারী হিসেবে। কিন্তু এখন অনেকেই তাদেরকে স্রেফ ইরানের ঘুঁটি মনে করেন।

হিজবুল্লাহ বিশেষজ্ঞ কাসিম কাসির বলেন, যুদ্ধে যাওয়ার কোনো আগ্রহই হিজবুল্লাহর নেই। তবে দীর্ঘদিন ধরেই লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে তারা। তিনি বলেন, ‘এই যুদ্ধ কেবল মিসাইলের যুদ্ধ হবে না।’ তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, উত্তর ইসরাইলের অংশবিশেষও দখলে নেওয়ার চেষ্টা করবে হিজবুল্লাহ।

এই অঞ্চলে ইসরাইলের শত্রুর অভাব নেই। তবে ইসরাইল হিজবুল্লাহকেই সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ মনে করে। ২০০৬ সালের যুদ্ধের সময় ইসরাইলের ভেতর প্রায় ৪ হাজার রকেট নিক্ষেপ করে তারা। এদের বেশিরভাগই ছিল লক্ষ্যবস্তুহীন ও সীমিত পাল্লার। কিন্তু এখন ইসরাইলি কর্মকর্তারাই বলছেন হিজবুল্লাহর আছে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার রকেট ও মিসাইল। এসব রকেট ও মিসাইল দিয়ে বস্তুত ইসরাইলের যেকোনো স্থানে আঘাত করা সম্ভব। এছাড়া হিজবুল্লাহর রয়েছে আধুনিক এন্টি-ট্যাঙ্ক মিসাইল, নাইট-ভিশন ইকুইপমেন্ট ও সাইবার যুদ্ধ চালানোর সক্ষমতা।

এছাড়া হিজবুল্লাহ সীমান্তের আশেপাশেই সক্রিয়, যেটি ২০০৬ সালের যুদ্ধ সমাপনী জাতিসংঘের অস্ত্রবিরতি চুক্তির লঙ্ঘন। এছাড়া ইসরাইল নিয়ন্ত্রিত গোলান উপত্যাকার পার্শ্ববর্তী দক্ষিণাঞ্চলীয় সিরিয়াতেও অবস্থান পাকা করে নিয়েছে হিজবুল্লাহ। ফলে ভবিষ্যতের যেকোনো যুদ্ধে ইসরাইলকে আঘাত হানার মতো বাড়তি জায়গাও পেয়েছে এই গেরিলা সংগঠন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ইসরাইল মনে করে নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তুতে টার্গেট করার মতো মিসাইল তৈরি করার চেষ্টা করছে হিজবুল্লাহ।

হিজবুল্লাহর শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা শেখ আলি দামুশ দাবি করেন, ইসরাইলিরা হিজবুল্লাহর মিসাইল প্রকল্প নিয়ে ভীত। তিনি বলেন, ‘যেকোনো লড়াইয়ে ইসরাইলকে মহাপরাজয়ের সম্মুখীন করানোর মতো ইচ্ছাশক্তি, সামর্থ্য ও শক্তিমত্তা রয়েছে প্রতিরোধ আন্দোলনের। এ কারণে ইসরাইলের চিন্তিত ও ভয় পাওয়ার কারণ রয়েছে।’

তবে এই লড়াই যত দেরিতে আসবে ভাবা হচ্ছে তারও আগে হয়ে যেতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সিরিয়ায় বিমান হামলা চালানোর কথা স্বীকার করেছে ইসরাইল। এগুলোর অনেকগুলোই হিজবুল্লাহর কাছে ইরানের সমরাস্ত্রের চালান বা মিসাইল প্রযুক্তি হস্তান্তর ঠেকাতে চালানো হয়েছে বলে দাবি ইসরাইলের। গত দুই মাসেই ৭ বার ইসরাইল সিরিয়ার অভ্যন্তরে বিমান হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছে সিরিয়া। এসব হামলার উদ্দেশ্য ছিল মূলত ইরান ও তাদের মিত্ররা।

ইসরাইলি কর্মকর্তারা বলছেন, ভয়াবহ করোনাভাইরাস সংকট, তেলের দামের অবনতি ও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের করুণ দশা কিংবা লেবাননের ঘরোয়া সমস্যার কারণেও হিজবুল্লাহর আচার-আচরণ পরিবর্তিত হয়নি। তারা এক্ষেত্রে বলছেন, সম্প্রতি ইসরাইলি বিমান সীমার ভেতর হিজবুল্লাহ ড্রোন প্রবেশ করাতে চেয়েছিল। গত মাসে হিজবুল্লাহ কর্মীরা ইসরাইল-লেবানন সীমান্ত বেষ্টনীর ক্ষতি করে বলেও অভিযোগ তাদের।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে এলইয়াকিম সামরিক ঘাঁটিতে বিরাট আকারে যুদ্ধের অনুশীলনে নেমেছে হাজার হাজার ইসরাইলি সেনা। মক আকারে লেবানিজ গ্রাম প্রস্তুত করে সেখানে হামলার অনুশীলন করছে স্থলবাহিনী। বিমান বাহিনী, নৌ ও সাইবার ইউনিটও ওই অনুশীলনে যোগ দিয়েছে।

ইসরাইলি কমান্ডার ফ্রেডলার বলেন, পরবর্তীতে যুদ্ধ হলে সীমান্ত অতিক্রম করে হিজবুল্লাহকে থামানো ছাড়া উপায় থাকবে না ইসরাইলের। তিনি বলেন, বেসামরিক মানুষের মাঝে লুকিয়ে থাকা হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে লড়াই করাটা অনেকটা যেন হাতে হ্যান্ডকাফ বেঁধে লড়াই করার মতো। তবে তিনি বলেন, তার যোদ্ধারা প্রস্তুত।

অপরদিকে হিজবুল্লাহও বলছে, পরবর্তী যুদ্ধে তারা শুধু প্রতিরক্ষাই নয়, বরং ইসরাইলের অভ্যন্তরে প্রবেশ করবে। ২০১৮ সালের শেষের দিকে ইসরাইলি সেনারা লেবানন থেকে ইসরাইলের ভেতর অবদি মাটির নিচের টানেল খুঁজে পায়। পরে সেগুলো ধ্বংস করা হয়।

তবে এত উত্তেজনা থাকলেও সীমান্তঘেঁষা অঞ্চলে বসবাসরত লেবানিজরা বলছেন, ইসরাইল দুই দশক আগে ফিরে যাওয়ার পর জীবনমানে ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। ইসরাইলি সীমান্তে আঙুর চাষী নিসিম স্টার্ন বলেন, দৈনন্দিন জীবন ভালো, তবে কিছু বাসিন্দা এখনও আতঙ্কে থাকে। তিনি বলেন, তার বিশ্বাস, যুদ্ধ হলে সেনাবাহিনী তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়ে সব ঠিক করে ফেলবে। তিনি বলেন, ‘আমাদের উচিৎ তাদেরকে শক্তভাবে আক্রমণ করে বের হয়ে আসা। যদি সমস্যা থাকে তাহলে সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে সেটা ঠিক করে নিন।’

অপরদিকে লেবাননের ফার চৌবা এলাকায় মুদি দোকানদের মোহাম্মদ আলি ইয়াহইয়া (৬২) বলেন, অতীতে মানুষজন ইসরাইলি সেনাবাহিনীকে নিয়ে আতঙ্কে থাকতো। কিন্তু এখন আর আগের দিন নেই। তার ভাষ্য, ‘ফের আক্রমণ করার সাহস তাদের কোনোদিনই হবে না।’

(বার্তা সংস্থা এপি’র প্রতিবেদনের অনুবাদ।)

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর