× প্রচ্ছদ অনলাইনপ্রথম পাতাশেষের পাতাখেলাবিনোদনএক্সক্লুসিভভারতবিশ্বজমিনবাংলারজমিনদেশ বিদেশশিক্ষাঙ্গনসাক্ষাতকাররকমারিপ্রবাসীদের কথামত-মতান্তরফেসবুক ডায়েরিবই থেকে নেয়া তথ্য প্রযুক্তি শরীর ও মন চলতে ফিরতে ষোলো আনা মন ভালো করা খবরকলকাতা কথকতা
ঢাকা, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০, বুধবার
শিক্ষাক্ষেত্রে করোনার থাবা

শ্রম বিক্রি ও ঋণের বোঝায় কাটছে শিক্ষকের দিনকাল

এক্সক্লুসিভ

পিয়াস সরকার | ২২ জুলাই ২০২০, বুধবার, ৭:৩৮

করোনার কালো থাবা অনেকের জীবন তছনছ করে দিয়েছে। বদলে দিয়েছে জীবন জীবিকার চিত্র। হঠাৎ মাথায় বাজ পড়ার মতো অবস্থা। বাঁচার অবলম্বন জীবিকায় টান দিয়েছে। দিশাহারা এসব মানুষ মহাসমুদ্রে সামান্য খড়কুটো আঁকড়ে বাঁচার চেষ্টা করছেন। এমনই একজন নিশান মাহমুদ। রংপুর শঠিবাড়ি সান সাইন কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষক। পরিবারের বড় ছেলে।
দায়িত্ব অনেক। বাড়িতে বৃদ্ধ বাবা-মা। করোনার শুরু থেকেই বন্ধ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। বন্ধ বেতনও। এমতবস্থায় সংসারের হাল ধরতে তুলে নিয়েছেন কোদাল। দিন মজুরি করে সংসার চালাচ্ছেন।

নিশান মাহমুদ মাস্টার্স শেষ করেছেন গত বছর। প্রস্তুতি নিচ্ছেন সরকারি চাকরির। সোনার হরিণ সরকারি চাকরি মিলছে না কিছুতেই। রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে লেখাপড়া সম্পন্ন করেছেন তিনি। বলেন, এছাড়া আর কোনো উপায় দেখছি না। জীবনতো বাঁচাতে হবে। এখন টিউশনিও নাই। খুব বিপদে আছি। এমন মানবেতর জীবন-যাপন করছেন বেসরকারি বিদ্যালয়ে কর্মরত লাখো মানুষ গড়ার কারিগর।

কুড়িগ্রামের প্রত্যন্ত এলাকা চিলমারী উপজেলার শিক্ষক শ্যামল কুমার বর্মণ। ২০ বছর ধরে শিক্ষকতা করছেন অধিকারীপাড়া নিম্ন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ে। বলেন, ২০ বছর ধরে আশার আলোয় বুক বেঁধে রয়েছি। কবে হবে এমপিওভুক্তি। শিক্ষকতার পাশাপাশি ভিন্ন পেশার সঙ্গে যুক্ত হয়ে জীবন-যাপন করছিলেন। কিন্তু করোনায় ভিন্ন আয়ের পথটাও বন্ধ। খুব কষ্টের মাঝে দিন কাটছে।  

দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার শিক্ষক রাহেতুল ইসলাম। স্কুল বন্ধ হওয়ায় ইজিবাইক চালাচ্ছেন এখন। তিনি বলেন, তার প্রথম সন্তানের জন্ম হয় জানুয়ারি মাসে। অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় স্ত্রীর শারীরিক নানা জটিলতা দেখা দেয়। এতে তার সঞ্চয়ের অনেক টাকা খরচ হয়। বলেন, স্কুলের বেতন ও টিউশনির টাকায় কোনোরকম চলতো জীবন। এরপর করোনার প্রকোপে সেটাও বন্ধ হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে চালাচ্ছি ইজিবাইক। প্রথম দিকে চালাতে পারতাম না হাত কাঁপতো। প্রশিক্ষণের জন্য যে একটা ইজিবাইক নেব সেটাও ছিল না। এভাবেই পেটে চারটা ডাল ভাত জুটছে।

ফুলসর আবদুর রহিম সরকার নিম্ন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়। নাটোর জেলার প্রত্যন্ত একটি স্কুল। এখনো এমপিওভুক্ত হয়নি প্রতিষ্ঠানটি। দীর্ঘদিন ধরে বিনা বেতনে পড়িয়ে আসছিলেন শিক্ষকরা। কিন্তু করোনাকালে সেই বিপদ যেন আরো ঘনীভূত হয়েছে। বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক মোতালেব হোসেন সরকার(রুবেল) বলেন, করোনা আসার আগে থেকেই আমাদের অবস্থা করুণ। বেতনছাড়া কাজ করে যাচ্ছি। অন্যান্য বিদ্যালয়ের মতো আমরা টিউশনিও করাই না। এমনকি শিক্ষার্থীদের সহযোগীতাও আমরা করে আসছি দীর্ঘদিন ধরে। করোনার এই সময়ে কোন রকম ঋণ করে চলছি আমরা। 

রাজধানীর শুক্রাবাদে থাকেন স্কুল শিক্ষিকা রেহানা আক্তার। তিনি বাধ্য হয়ে এখন নিজ হাতে বানানো নাড়ু বিক্রি করছেন বাড়ি বাড়ি গিয়ে। দিচ্ছেন বিভিন্ন দোকানেও। মোহাম্মদপুর গ্রিন লিফ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের শিক্ষক কাওসার হোসেন। বাধ্য হয়ে বিক্রি করছেন মৌসুমী ফল। নিজের স্কুলের সামনেই পসরা সাজিয়ে বসেন এসব ফলের।  করোনার প্রকোপে নাজেহাল অবস্থা তার। বাংলাদেশে কিন্ডারগার্টেন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ঐক্যপরিষদের মহাসচিব সাফায়েত হোসেন বলেন, চারমাস ধরে বাড়ি ভাড়া ও শিক্ষকদের বেতন পরিশোধ করতে না পারায় ব্যক্তি মালিকানাধীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ৬০ হাজার কিন্ডার গার্টেন স্কুলের ৭০ শতাংশ শিগগিরই বন্ধ হয়ে যাবে। এ খাতকে বাঁচাতে চাই আর্থিক সহায়তা। কিন্ডার গার্টেন এসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান মনোয়ারা ভূঞা বলেন, অভিভাবকরা টিউশন ফি দিচ্ছেন না। তাই আমরাও শিক্ষকদের বেতন দিতে পারছি না।

পদে পদে নানা হয়রানির শিকার হয়ে এখন পথে পথে ঘুরছেন বেসরকারি নিবন্ধন ও প্রত্যায়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ)’র মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া বৈধ এক শিক্ষক। নিয়োগ পেয়েও তিনি আজ ১৮ মাস বেতন পাননি। ফলে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা পৌরসভার নওদাপাড়া গ্রামের গোলজার হোসেনের পুত্র শাহিদুজ্জামান। তিনি এনটিআরসিএর মাধ্যমে কুষ্টিয়া স্বস্তিপুর ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসার এবতেদায়ী শাখার শিক্ষক নিয়োগ পান। এনটিআরসির নির্দেশের পর মাদ্রাসার পরিচালনা পর্ষদ তাকে নিয়োগপত্র প্রদান করেন। শাহিদুজ্জামান জুনিয়র শিক্ষক পদে যোগদান করেন। এরপর থেকেই মাদ্রাসায় নিয়মিত পাঠদান অব্যাহত রাখেন তিনি। গত ১১ই এপ্রিল ২০১৯ এমপিওভুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যাদিসহ অনলাইনে এমপিও’র আবেদন করেন। কিন্তু ১৮ মাস অতিবাহিত হলেও আজো তাকে এমপিওভুক্ত করা হয়নি। শাহিদুজ্জামান জানিয়েছেন, স্বস্তিপুর মাদ্রাসাটি দাখিল স্তর পর্যন্ত। এখানে লেকচারার বলে কোনো পদ নাই। ইবতেদায়ী বিভাগে জুনিয়র শিক্ষকসহ ৪ জন এমপিওভুক্তির যোগ্য। তিনি জানান, মাদ্রাসা এমপিও নীতিমালা ২০১৮’র ৭নং পৃষ্ঠায় বর্ণিত পদ সমন্বিতকরণ অংশের তথ্য মোতাবেক আমার পদটি আইনসিদ্ধ এবং এমপিও’র যোগ্য। কিন্তু ১৮ মাসেও আমার এমপিওভুক্তি হয়নি।

তিনি বলেন, বেতন ছাড়া টিউশনি পড়িয়ে কোনোরকমে জীবন অতিবাহিত করছিলাম। প্রতিষ্ঠান থেকে বেতন দেয়া হয় না। সেইসঙ্গে করোনার প্রভাবে জীবন যেন থমকে আছে। ছোটভাই চাকরি করে এই দিয়ে কোনোরকমে জীবন চলছে। ছোটভাইয়ের আয়ে চলতে অনেক খারাপ লাগে।

স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ মো. শাহজাহান আলম সাজু বলেন, শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় চার কোটি শিক্ষার্থী, ১৪ লাখ শিক্ষক এবং আট লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে প্রায় ৯৭ শতাংশ শিক্ষা বেসরকারি খাতে পরিচালিত হয়। প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায়কৃত টিউশন ফি থেকে ব্যয় নির্বাহ হয়। এই আয় এখন বন্ধ। সঙ্গে বন্ধ টিউশনি। ফলে খুবই মানবেতর জীবন-যাপন করছেন শিক্ষকরা।

এই শিক্ষকদের তালিকা করে একাংশকে সহযোগিতার উদ্যোগ নেয় সরকার। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে জানা যায়, শিক্ষকদের এককালীন পাঁচ হাজার ও কর্মচারীদের দুই হাজার পাঁচশ’ করে টাকা দেয়া হবে। এ প্রসঙ্গে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ডিজি সৈয়দ গোলাম ফারুখ বলেন, প্রায় ৪৭ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে। কলেজ পর্যায়ে দুই মাসের বেতন দেয়ার নির্দেশ দিয়েছে সরকার।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মমিনুর রশিদ আমিন বলেন, আমরা জেলা প্রশাসকদের কাছে শিক্ষকের নামের তালিকা চেয়েছিলাম। তারা এটি পাঠানোর পর যাচাই-বাছাই করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠাই। সেখান থেকে সরাসরি জেলা পর্যায়ে যায়। এই অর্থ প্রদানের জন্য ১ লাখ ৬০ হাজার চেক দেয়া হয়। এতে মধ্যস্বত্বভোগীদের কোনো সুযোগ নেই। এই অর্থ শিক্ষকরা পাচ্ছেন।

অবশ্যই দিতে হবে *
অবশ্যই দিতে হবে *
অন্যান্য খবর